আত্মার বিশুদ্ধতা সাফল্যের চাবিকাঠি

তাজা খবর, ইসলাম ডেস্ক :: রুহ, যাকে আমরা আত্মা বলে থাকি। রুহ বা আত্মার রূপ-প্রকৃতি নিয়ে মানুষের মধ্যে আলোচনা-পর্যালোচনার অন্ত নেই। প্রকৃতপক্ষে আমাদের সফলতা ও ব্যর্থতার জন্য আত্মজ্ঞান অতীব জরুরি। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে আমরা আত্মার পরিচয় ও আত্মার রূপ-প্রকৃতি সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করব।

অবিশ্বাসীরা মহানবী (সা.)-কে আত্মা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। আল্লাহ তাআলা ওহি নাজিলের মাধ্যমে তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। আত্মা হচ্ছে মহান আল্লাহর আদেশ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষ আপনাকে রুহ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে, আপনি বলুন : রুহ আমার প্রভুর আদেশ। তোমাদেরকে যে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তা নিতান্তই সামান্য।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৮৫)

রুহের পরিচয় : মানব সৃষ্টির উৎস এবং আল্লাহর আদেশগত অদৃশ্য মৌলিক বস্তুটি হলো রুহ বা প্রাণ। যা মানবদেহে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় একজন মানুষ জীবিত থাকে। আর মানবদেহ থেকে পৃথক হয়ে গেলে একজন মানুষ লাশে পরিণত হয়। শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ. লিখেছেন, প্রাণিজগতের আয়ুষ্কালের ভিত্তি ও উৎসই হলো রুহ। যতক্ষণ তা যে প্রাণীর দেহে অবস্থান করে, সেটা জীবিত থাকে। যখনই রুহ দেহ ছেড়ে চলে যায়, প্রাণীটি মারা যায়। রুহ সম্পর্কে এর চেয়ে বেশি বিবরণ ইসলাম প্রদান করে না। কারণ, তা বোঝা সাধারণ লোকের সাধ্যাতীত ব্যাপার এবং তাদের কোনো প্রয়োজন এটা বোঝার ওপর নির্ভরশীলও নয়। রুহ সম্পর্কে এতটুকু জ্ঞান মানুষের জন্য যথেষ্ট। (ফাতহুল কাদির)

সৃষ্টির সময়কাল বিচারে সব মানুষের রুহ মহান আল্লাহ পাক একই সময়ে সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীতে আগমন হিসেবে কোনো রুহ তার দেহসহ কিছুকাল আগে পৃথিবীতে আগমন করে, কোনো রুহ কিছুকাল পরে পৃৃথিবীতে আগমন করে। পরকালীন বিচারের সময়ে সব রুহকে একই সময়ে আপন আকৃতি প্রদান করে পুুনরুত্থান ঘটানো হবে। বিচারকাজ সমাধান করে কাউকে জান্নাত আবার কাউকে জাহান্নাম প্রদান করা হবে।

আমি, তুমি এবং সে—এর প্রকৃত রূপ হচ্ছে রুহ। মানবদেহ রুহের বাহন। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রুহের আজ্ঞাবহ সৈনিক। মানবদেহকে যদি একটা রাজ্য ধরা হয়; তাহলে রুহ হচ্ছে সেই দেহরাজ্যের বাদশা।

একজন মানুষ মৃত্যুবরণ করলে বলা হয়ে থাকে—তিনি পরলোকগমন করেছেন। যদিও তার দেহখানা আমাদের সামনেই থাকে। কিন্তু তার আত্মাটা মহান প্রভুর কাছে চলে যায়। কাজেই এখানে তিনি মারা গেছে বলে রুহকে বোঝানো হয়েছে; শবদেহকে নয়। আত্মাকে প্রকৃতপক্ষে পরকালের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আত্মা তার পারলৌকিক সুখ-শান্তি ও সৌভাগ্য অন্বেষণ করবে, এটাই তার কাজ। আল্লাহর মারেফাত অর্জন করে যে আত্মা যতটা উন্নতি লাভ করবে আখেরাতে সে আত্মা ততটাই সৌভাগ্যবান হবে।

চক্ষু কর্ণ নাসিকা তথা বহিরিন্দ্রিয় এবং বুদ্ধি-বিবেক মনোবৃত্তি বিবেচনা শক্তি ইত্যাদি অন্তরিন্দ্রিয় এগুলোর সমন্বয়ে আত্মা আল্লাহর মারেফাত লাভ করে।

এ প্রসঙ্গে জগদ্বিখ্যাত দার্শনিক ইমাম গাজ্জালি রহ. বলেন, আত্মা মূলত তার দেহরাজ্যকে কাজে লাগিয়ে তার লক্ষ্য অর্জনে নিবৃত্ত হয়। যেমন আত্মা একজন শিকারি পুরুষ, মারেফাত বা তত্ত্বজ্ঞান তার শিকার। দেহের অন্তরিন্দ্রিয় ও বহিরিন্দ্রিয়গুলো তার সৈনিক ও শিকারের জাল। শিকারি আত্মা দেহ নামক বাহনে আরোহণ করে অন্তরিন্দ্রিয় ও বহিরিন্দ্রিয়গুলোকে অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে মারেফাত ও তত্ত্বজ্ঞান লাভের দিকে ধাবমান হয়। অন্যদিকে মানবদেহ সুরক্ষার জন্য হাত-পা-মুখ দাঁত ইত্যাদি কিছু দেহরক্ষী রয়েছে। আর দেহের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন পূরণের জন্য আহারেচ্ছা, পানেচ্ছা ও কামেচ্ছা ইত্যাদি কিছু অভ্যন্তরীণ সৈন্যসামন্তও রয়েছে।

যার কারণে দেহ একদিকে আত্মার আজ্ঞাবহ অন্যদিকে তার দেহরক্ষীদের প্ররোচনার শিকার। এই অবস্থায় আত্মা যদি দেহরাজ্য ও তার সৈন্যসামন্তকে কঠিন হস্তে নিয়ন্ত্রণ করে আল্লাহর মারেফত লাভের দিকে ধাবিত হতে পারে তাহলে এই আত্মা সফলতা লাভ করে। আর আত্মা যদি এতে ব্যর্থ হয় বরং দেহের প্ররোচনায় দুর্বল হয়ে দেহের অনুগত হয়ে যায় তাহলে সেই আত্মা ব্যর্থ হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়। (কিমিয়ায়ে সায়াদাত)

সুতরাং রুহের কর্মপরিধি, রুহের খোরাক এবং রুহকে শক্তিশালীকরণে রুহের পরিচয় জানার বিকল্প নেই। আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে আত্মপূজার অহমিকা থেকে মুক্তি দিন। আমিন।

লেখক : খতিব

বায়তুল ফালাহ জামে মসজিদ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।

 

 

সংবাদটি শেয়ার এবং লাইক করুন