সম্ভাবনার নতুন চ্যালেঞ্জে বিশ্ব

রায়হান আহমেদ তপাদার : চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মূলত প্রযুক্তির বিপ্লব, যা পৃথিবীর মানুষকে একলাফেই একশত বছর সামনে নিয়ে যাবে। বলা হচ্ছে, এই পরিবর্তন সব মানুষের জীবনমান উন্নত করবে, আয় বাড়াবে সব শ্রেণির মানুষের। প্রযুক্তির উৎকর্ষ কাজে লাগিয়ে পরিবর্তিত-পরিবর্ধিত হবে শিল্প অর্থনীতির সকল ক্ষেত্র। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব পৃথিবীকে আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বগ্রামে পরিণত করবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা হবে অভাবনীয় উন্নত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হবে পাড়ার দোকানে কেনাবেচার মতই সহজ। এই ডিজিটাল বিপ্লব সম্পর্কে জানার পূর্বে তার আগের তিনটি শিল্প বিপ্লব সম্পর্কে কিছু ধারণা নেয়া আবশ্যক তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের ঠিক ৫০ বছর পরই শোনা যাচ্ছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের গান।
ক্লাউস সোয়াব ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডাব্লিউইএফ) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান ২০১৬ সালে সর্বপ্রথম চতুর্থ শিল্প বিপ্লব কথাটি ব্যবহার করেন তাঁর ‘দ্য ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন’ নামক বইয়ে। ক্লাউস সোয়াব চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে নিজের লেখা প্রবন্ধে বলেছেন, “আমরা চাই বা না চাই, এত দিন পর্যন্ত আমাদের জীবনধারা, কাজকর্ম, চিন্তাচেতনা যেভাবে চলেছে, সেটা বদলে যেতে শুরু করেছে। এখন আমরা এক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আগেকার বিপ্লবগুলোর মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল কৃষি, প্রাণিশক্তি, রাজনৈতিক শক্তি, ভৌগোলিক পরিবর্তন ইত্যাদি। কিন্তু চতুর্থ শিল্প বিপ্লব অনেকাংশেই ভিন্ন। অন্যান্য শিল্প বিপ্লবের সাথে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রধান পার্থক্য হচ্ছে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্প বিপ্লব শুধুমাত্র মানুষের শারীরিক পরিশ্রমকে প্রতিস্থাপন করেছে; কিন্তু চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শুধুমাত্র শারীরিক নয়, মানসিক পরিশ্রমকে প্রতিস্থাপন করবে।
উন্নত বিশ্বে ডাক্তারদের আধুনিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদানে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা কৌশলগত দক্ষতা, অপারেশন ও রোগ সম্পর্কিত তাত্ত্বিক বিষয়াদির কার্যপ্রণালী অনুশীলন করতে সক্ষম হন। ভার্চুয়াল রিয়ালিটির মাধ্যমে ভার্চুয়ালি ড্রাইভিং ও ড্রাইভিংয়ের নানা নিয়ম-কানুন খুব সহজেই এর ফলে আয়ত্ত করা সম্ভব। উন্নত বিশ্বের বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা কিংবা সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে বিমান পরিচালনা প্রশিক্ষণে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ব্যবহার করছে। ভার্চুয়াল রিয়ালিটি কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে ফ্লাইট সিমুলেশনের ক্ষেত্রে স্বল্প খরচে বিমানচালকের প্রশিক্ষণ প্রদান করা সম্ভব হয়। বিভিন্ন ধরনের সামরিক প্রশিক্ষণে ভার্চুয়াল রিয়ালিটিকে গুরুত্বের সাথে ব্যবহার করা হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ব্যবহার করে তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সহজ করা হয়েছে। সবাই জানে মহাশূন্য অভিযানের প্রতিটি পর্বেই রয়েছে নানা ধরনের ঝুঁকি, তাই প্রস্তুতিপর্বের নানা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নভোচারীদের কার্যক্রম, নভোযান পরিচালনা সম্পর্কিত যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণে তাই ভার্চুয়াল রিয়ালিটি বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। এমনকি বর্ধিত বাস্তবতা বা অগমেন্টেড রিয়ালিটি-অগমেন্টেড রিয়ালিটি হলো এমন এক প্রযুক্তি, যাকে বাস্তব জগতের এক বর্ধিত সংস্করণ বলা যেতে পারে।এছাড়া ইন্টারনেট অব থিংসকে সংক্ষেপে আইওটি বলে, যার বাংলা অর্থ হল বিভিন্ন জিনিসের সাথে ইন্টারনেটের সংযোগ। আমাদের চারপাশের সকল বস্তু যখন নিজেদের মধ্যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ করবে এবং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে, সেটাই হবে ইন্টারনেট অব থিংস।
ইতিমধ্যে আমরা গুগল হোম, অ্যামাজনের আলেক্সার কথা শুনেছি, যা আপনার ঘরের বাতি, সাউন্ড সিস্টেম, দরজাসহ অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আপনার বাসার চুলাকে আপনি একবার শিখিয়ে দেবেন কখন কী খেতে পছন্দ করেন। ধরুন বৃষ্টির দিনে আপনি খিচুড়ি ভালোবাসেন, আপনার চুলা সেটা মনে রাখবে এবং বাইরে বৃষ্টি পড়লে সেদিন আপনার জন্য খিচুড়ি রান্না করে রাখবে। আপনি সকালে ডিম-রুটি খাবেন, সেটাও সে প্রতিদিন করে দেবে অথবা সপ্তাহের একেক দিন তাকে একেক রেসিপি রাঁধতে বলবেন, সে তাই করবে। বাড়ির দরজা দিয়ে যখন বেরিয়ে যাবেন আপনাকে দরজা লাগাতে হবে না, আপনি বাড়িতে নেই জেনে দরজাটি আর খুলবে না, আবার আপনি এসে যখন দরজার সামনে দাঁড়াবেন, আপনার চোখ, হাত, পা, শরীর দেখেই আপনাকে চিনে নিজে নিজেই খুলে যাবে। আপনার চোখের চশমা কিংবা কানের হেডফোনই আপনাকে রাস্তা দেখাবে আর সব তথ্য দিয়ে দেবে।চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটছে খুব দ্রুত। মানুষ বর্তমান নিয়ে ব্যস্ত; কিন্তু নতুন প্রযুক্তির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এ বিপ্লবের প্রভাব মানবসভ্যতার ওপর অনেক গভীর ও ব্যাপক। এটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দিতে পারে, আবার নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে।
অপরদিকে যেসব দেশের কাছে প্রচুর অর্থ আছে, তারা গবেষণায় ব্যয় করে অধিক মুনাফা অর্জন করতে পারবে। ধনী ও গরিব দেশের পার্থক্য বেড়ে যাবে। কাজগুলো ভাগ হয়ে যাবে অদক্ষ-স্বল্প বেতন ও অতি দক্ষ-অধিক বেতন-এসব শ্রেণি বিভাগে দক্ষ ব্যক্তিরা কাজ পাবে, অদক্ষ ব্যক্তিরা বেকার হয়ে যাবে।
এমনকি মানুষের শরীরে চিপস অনুপ্রবেশ করিয়ে রেখে দেওয়ার প্রযুক্তি বের হয়েছে। ভবিষ্যতে শরীরে স্থাপিত চিপস স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করতে পারবে। তবে চিপসের কারণে মানুষের ব্যক্তিজীবন বা গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হতে পারে। বিশ্বে এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে অনেক আলোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। বিশ্ব একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রযুক্তিগত বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যা অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতি- সর্বোপরি মানুষের জীবনযাত্রায় একটি মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। এই বিপ্লব কিভাবে সংগঠিত হবে তা আমরা এখনও নিশ্চিতভাবে জানি না, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে এর মধ্যে একটি সামগ্রিক রূপান্তর সাধিত হবে। এই রূপান্তর আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য ঝুঁকি নাকি সম্ভাবনা তৈরি করবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আমরা এই পরিবর্তনকে কিভাবে গ্রহণ করব তার ওপর। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সকল ঝুঁকিকে সম্ভাবনায় রূপান্তরের জন্য দরকার বিস্তর আলোচনা, সচেতনতা এবং সামগ্রিক পরিকল্পনা যা টেকসই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে, বৈষম্য দূর করবে, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করবে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত করবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে কোন্ প্রযুক্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট মানুষের একঘেয়ে ক্লান্তিকর কাজের অবসান ঘটাচ্ছে। ফলে তা অপ্রীতিকর শ্রম থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এছাড়া চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কিছু আবিষ্কার, যেটা শ্রমিকের পুরো অংশকে প্রতিস্থাপন করবে না; বরং একটা নির্দিষ্ট অংশকে প্রতিস্থাপন করবে।
এর ফলে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে, যা তাদের মজুরি বৃদ্ধি করবে। কিছু আবিষ্কার শ্রমিকের সম্পূর্ণ অংশকে প্রতিস্থাপন করবে; যার ফলে তৈরি হবে বেকারত্ব। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম দাবি করেছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মানুষ তাদের চাকরি হারাতে পারে, প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবে প্রায় ৫.৭ মিলিয়ন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশি বিদেশ থেকে তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত হতে পারে। বলা হয় যে, একটি মেশিন সম্ভাব্যভাবে ১০ জন কর্মীকে ছাঁটাই করতে পারে। অন্য একটি লক্ষণীয় বিষয় হল, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়মিত শ্রমিকের পরিবর্তে অনিয়মিত শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি করবে; এর ফলে শ্রমিককে কোন প্রকার ভাতা প্রদানের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে আগামী কয়েক বছরেই মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কী প্রভাব পড়বে, সেটি নিয়ে দুই ধরনের মত পাওয়া যাচ্ছে। একদল বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই বিপ্লবের ফলে সব মানুষেরই আয়ের পরিমাণ ও জীবনমান বাড়বে। সব কিছু সহজ থেকে সহজতর হবে এবং মানুষ তার জীবনকে আরও বেশি মাত্রায় উপভোগ করবে। এছাড়া পণ্য বা সেবা উৎপাদন ও প্রদান প্রক্রিয়ায়ও আসবে ব্যাপক পরিবর্তন। এমনকি এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্য পাঠানোর খরচ অনেক কমে আসবে।ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। আগে যেমন বাসায় বসে সদাই করার কথা কল্পনাও করা যেত না, সামনে হয়ত বাসার বাইরে একদমই না গিয়েও সারা বিশ্বের সব সুবিধা ভোগ করে জীবন যাপন করা যাবে।
অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি, রোবটিকস এবং অন্যান্য উদীয়মান প্রযুক্তির উদ্ভাবনগুলো আমাদের ক্ষমতা, আমাদের পরিচয় এবং আমাদের সম্ভাব্যতাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে চলেছে। তবে আরেক দল বিশেষজ্ঞ ধারণা করেন, ডিজিটাল বিপ্লব বিশ্বের অসাম্য ও দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরও দুর্বিষহ পর্যায়ে নিয়ে যাবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে মানুষের দ্বারা সম্পন্ন অনেক কাজ রোবট ও যন্ত্রপাতি দিয়ে করা হবে, এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে তা সমস্যা তৈরি করবে। এছাড়া শ্রমবাজারে অল্প কর্মদক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা ও বাজার কমে যাবে, যা উন্নয়নশীল দেশ গুলোকে বেশি করে সমস্যায় ফেলবে। এর ফলে সারা বিশ্বে সম্পদ-বৈষম্য আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বাড়বে বলে অনেকের আশঙ্কা। ডিজিটাল প্রযুক্তির আবিষ্কারক, বিনিয়োগকারী দেশগুলো এর থেকে যতটা লাভবান হবে, অন্য দেশগুলো সেটা থেকে বঞ্চিত হবে। তাঁদের ধারণা, শুধুমাত্র একটি পক্ষ বা কিছু দেশ বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাবে সব নিয়ন্ত্রণ। তারাই সব সুবিধা নিজেদের করে রাখতে পারে এবং অন্যরা বঞ্চিত হতে পারে এবং পিছিয়ে যাবে অনেক, যেমনটি শিল্প বিপ্লবের প্রথম দিকে ছিল। যাদের সম্পদ থাকবে তারাই দুর্বলকে আরও ঘায়েল করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অগ্রযাত্রাকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করার জন্য আমাদের অবশ্যই অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে,বিশেষত সাম্য, কর্ম- সংস্থান, গোপনীয়তা রক্ষা এবং আস্থার ক্ষেত্র গুলোতে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবগুলোকে অবশ্যই রোধ করতে হবে। পরিশেষে বলা যেতে পারে, প্রযুক্তি ভাল বা খারাপও নয় আমরা এটিকে কিভাবে ব্যবহার করব তাই পার্থক্য তৈরি করবে।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট
raihan567@yahoo.com
সংবাদটি শেয়ার এবং লাইক করুন