অগণিত অপরাধের হোতা আল-জাজিরার ‘সামি’

তাজা খবর, ফাহিম আহমেদ : কখনও তানভীর সাদাত, কখনও সায়ের জুলকারনাইন। আবার কখনও জুলকারনাইন সায়ের খান, এভাবে নাম বদলে প্রতারণাসহ অগণিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিটিই আল জাজিরা ফিল্মের সামি। তার প্রকৃত নাম সামিউল আহমেদ খান।

সব সেনানিবাস থেকে বহিস্কৃত হওয়ার সময় তার নাম ছিল ‘সামিউল আহমেদ খান’। মাদক ও অন্ধকার জগতে জড়িয়ে বেছে নেন নতুন নাম সায়ের জুলকারনাইন। গত কয়েক বছর ধরে পাহাড়ি উগ্রবাদীদের সঙ্গে জড়িত সামি। আল জাজিরা ইস্যুতে তার সহপাঠী ও পরিচিতরাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব অভিযোগ করছে।

  • আরও খবর পড়ুন….

টার্গেট করে প্রতারক সিন্ডিকেট

শিশুকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত যার (সামির) বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। তাকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান ও সেনাবাহিনী নিয়ে ফিল্ম তৈরি করেছে আল জাজিরা।

পিতার ভুয়া নাম দিয়ে পাসপোর্ট ও ড্রইভিং লাইসেন্সে করেন সামি। দুই যায়গায় তিনি পিতার নাম দিয়েছেন ওয়াসিট খান। কিন্তু তার বাবার প্রকৃত নাম বাসিত খান। সামির বাবা মো. আবদুল বাসেত খান ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। আবদুল বাসেতের চার সন্তানের মধ্যে সামিউল আহমেদ খান সবার বড়। জন্ম ১৯৮৪ সালে হলেও স্কুলের তথ্য মোতাবেক তার জন্ম তারিখ ৮ অক্টোবর, ১৯৮৬। কৈশোর থেকেই তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ উঠতে থাকে।

১৪ বছর বয়সে সামি মাকে হারায়। তার দুই বছর পর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সৎ মায়ের সংসারে তখন থেকেই অন্ধকার জগতে পা বাড়ায় সামি। ক্যাডেট কলেজ থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর ভর্তি হয় কুমিল্লার ইস্পাহানি স্কুলে। ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়স থেকে ড্রাগ নেয়া, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করাসহ নানা অভিযোগ ওঠে সামির বিরুদ্ধে। মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে সহপাঠী বন্ধুরাও তাকে এড়িয়ে চলতো।

  • আরও খবর পড়ুন….

সারাদেশে ভয়াবহ প্রতারণার ফাঁদ, অসংখ্য জিডি ও মামলার আসামি আতিক

সামির বিরুদ্ধে মামলা:
গেল বছর সাইবার ক্রাইম ইউনিট অনলাইনে জাতির পিতা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কট‚ক্তি ও আপত্তিকর প্রচারণা এবং করোনা ভাইরাস নিয়ে অপপ্রচারসহ বিভিন্ন গুজব রটিয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য যাদের বিরৃদ্ধে অভিযোগ গঠন করে তাদের মধ্যে অন্যতম শায়ের জুলকারনাইন সামি। উই আর বাংলাদেশি পেইজ থেকে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে অভিযুক্তদের ল্যাপটপ ও মোবাইল অনুসন্ধান করে ১১ জনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায় গোয়েন্দা বাহিনী। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাসনিম খলিল ও সামিসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ৬ মে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা করে র‌্যাব-৩। এ মামলার প্রতিবাদে কলাম লিখেছিলেন আল জাজিরার ভাষ্যকার ডেভিড বার্গম্যান।

নিষিদ্ধ সামি আল জাজিরার কেন্দ্রীয় চরিত্র:
কৈশোর বয়সে চুরিতে হাত পাকান সামিউল আহমেদ খান ওরফে সায়ের জুলকারনাইন ওরফে সামি। ১৭ বছর বয়সে ২০০০ সালের ৩০ জানুয়ারি ইসিবিতে কর্মরত মেজর ওয়াদুদের বিদেশ থেকে আনা ট্র্যাকস্যুট চুরি করে ধরা পড়েন। ২০০০ সালের জুলাই মাসে টাইগার অফিসার্স মেস থেকে হাতির দাঁত চুরি করে চট্টগ্রামের নিউমার্কেটে অঙ্গনা জুয়েলার্সে বিক্রি করেও ধরা পড়েন। বাবার চাকরির সুবাদে নিজেকে কখনও সেনাবাহিনীর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট, কখনও ক্যাপ্টেন হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দিতেন। ২০০১ সালের ২৮ ও ২৯ এপ্রিল ঢাকা সেনানিবাসে নিজেকে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রবেশ করে সামি। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বন্ধু উৎপলের কাছে নিজেকে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে প্রমাণের জন্য বেল্ট, বুট ও র‌্যাংক ইউনিফর্ম কেনেন। উৎপলের বাসা থেকেই সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম পরে ট্যাক্সি ক্যাব দিয়ে সেনানিবাসসহ ঢাকার একটি পত্রিকা অফিস, রাপা প্লাজা, ধানমন্ডি ও চিড়িয়াখানা ঘুরে জাহাঙ্গীরগেট হয়ে সিএমএইচে প্রবেশের সময় দুপুর ২টায় মিলিটারি পুলিশের (এমপি) হাতে ধরা পড়ে সামি। এর ঠিক দু’দিন পর ২ মে বাবার অঙ্গীকারনামায় আর্মি এমপি ডেস্ক থেকে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।

র‌্যাব পরিচয়ে প্রতারণা ও গ্রেপ্তার:
২০০৬ সালের ২০ জুলাই র‌্যাব কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে রাজধানীর ফার্মগেটের এজে টেলিকমিউনিকেশন থেকে ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার মোবাইল ফোন কিনে একটি ভুয়া চেক দেন। একইভাবে প্রাইজ ক্লাব নামক একটি কম্পিউটার ফার্ম থেকে ১০টি ল্যাপটপ কেনার কথা বলে, পরে চেক দিয়ে ২টি ল্যাপটপ নিয়ে আসে। চেক ডিজঅনার হলে অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাব-১ তাকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনার পর তাকে এনপিজি ঘোষণা করে সব সেনানিবাস ও দপ্তরে অবাঞ্ছিত করা হয়। এ ঘটনার পর অনিয়ন্ত্রিত ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্য সামিকে ত্যাজ্য করেছিলেন তার বাবা। পরদিন ২০০৬ সালের ২৩ জুলাই এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন লে. কর্নেল আবদুল বাসেত।

সামির নারী কেলেঙ্কারি:
সেনাকর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বিয়ে করেছিলেন সামি। এন্টেনা ভাঙ্গা ভি.এইচ.এফ (ওয়াকিটকি) নিয়ে মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা দেয়ার নামে কয়েকজনের কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা নেন। ব্যবসার কথা বলেও অনেকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন। প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে এক সেনাকর্মকর্তার মেয়েকেও বিয়ে করেন। শ্বশুরের অর্থে হাঙ্গেরিতে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করার পর বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন সামি। ব্যবসা বাণিজ্যের কথা বলে টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য অনেকেই তাকে খুঁজছেন। বহুদিন প্রকাশ্যে আসতে পারেন না।

 

সংবাদটি শেয়ার এবং লাইক করুন