অগ্রগতির গতি: বাংলাদেশের মতোই বাংলাদেশ

মোস্তফা কামাল : বাংলাদেশ জন্মেছে বাংলাদেশের মতো। টিকে আছে নিজের মতো। এর প্রতিটি অর্জনেও নিজস্বতা। অর্থনীতি বা সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক নিয়ম-নীতি, বিধান এখানে তেমন খাটছে না। আবার বাংলাদেশের একেকটি অঘটনেও তাই। বিশ্ববাস্তবতায় মেলে না। নজির পাওয়া যায় না। করোনার বৈশ্বিক বিপর্যয়ে কাবু বাংলাদেশও। শিক্ষা, শিল্পকারখানাসহ চারদিক বিপর্যস্ত। তার ওপর প্রাকৃতিক-সামাজিক বেহাল দশা। এর মাঝেও ঘুরে দাঁড়ানোর চরিত্রের ছাপ। অন্যভাবে বলা যায়, এটাই বাংলাদেশ।

জন্মের আগ থেকেই বাংলাদেশ অঞ্চল নিয়ে মন্দ কথার ছড়াছড়ি। জন্মের পর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে হেন কুকথা নেই বাংলাদেশ নিয়ে। তার ওপর চুরি, দুর্নীতি, অনিয়ম, পাচার, খুন-খারাবির অভিযোগ অন্তহীন। এসবের আলোকে ‘দেশটা টিকবে কি না’- এমন সংশয়ভরা আফসোস প্রচুর। এর মাঝেই বাংলাদেশ কেবল টিকে আছে নয়, এগিয়েও যাচ্ছে চমকিতভাবে। নানা সূচকে ম্যাজিকের মতো অগ্রগতি। অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতির সংজ্ঞা বা নিয়মে যার কূলকিনারা মেলে না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নানা গবেষণা ও জরিপে তার প্রকাশ ঘটছে। ম্যাজিক বুঝতে জটিলতায় পড়তে হয় জরিপকারকদেরও। আবার অগ্রগতিটা অস্বীকার বা চাপা দেয়ার অবস্থাও নেই। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক নিবন্ধেও এসেছে বাংলাদেশের এ উত্থানের কিছু তথ্য। সেখানে বলা হয়েছে- রপ্তানি আয়ের ওপর ভর করে গত এক দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় চাঙ্গা অর্থনীতির নজির তৈরি করেছে বাংলাদেশ।

নিবন্ধটির তথ্যে দেখা যাচ্ছে গত এক দশকে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানির অভাবনীয় হাইজাম্প। এই সময় বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ডলারের হিসাবে ৮০ শতাংশ বেড়েছে। ‘বাংলাদেশ ইজ বিকামিং সাউথ এশিয়াস ইকোনমিক বুল কেইস’ শিরোনামে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের হংকংভিত্তিক আর্থিক বাজার বিশ্লেষক মাইক বার্ডের লেখা ওই নিবন্ধে বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রাকে তুলনা করা হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ভিয়েতনামের সঙ্গে। উন্নয়নশীল দেশের সুপারিশ অর্জনের পেছনে এ দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, মজুরির ক্ষেত্রে ধারাবাহিক প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় নারী-শ্রমগোষ্ঠীর দৃঢ় ও বর্ধনশীল অবস্থানের কথা এসেছে নিবন্ধটিতে।

গণিত বা তত্ত্বগত বাস্তবতার বিপরীতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি চমকের সঙ্গে ভাবনার খোরাক দেয়। কীভাবে সম্ভব হচ্ছে এ অর্জন- তা নিয়ে ভাবনা থেমে নেই। চলতিসহ বিগত ছয় অর্থবছরে অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ থিতু হয়ে গেছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়লেও, বছর বছর রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি শতকরা ১৭-২০ হলেও যথেষ্ট উচ্চ প্রবৃদ্ধি (৪০ শতাংশের বেশি) প্রাক্কলন করেই ২০২০-২১-এর জাতীয় বাজেটে রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ বিষয়ক বোদ্ধাদের ধারণা, বাস্তবায়নের বাস্তবতায় বছরের মাঝপথে গিয়ে উন্নয়ন বাজেটে বড় কাটছাঁট করা লাগতে পারে। অনুন্নয়ন বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাত বিশেষ করে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণসহ স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো লাগতে পারে। ব্যাংক ঋণসহ নানান সংস্কারের শর্ত সংবলিত দাতা সংস্থার বাজেট সাপোর্ট ফান্ডের দ্বারস্থ হওয়া লাগতে পারে। যা করা দরকার তাই করা হবে এমন আভাস তো অর্থমন্ত্রী দিয়েই আসছেন।

বাংলাদেশের অব্যাহত অর্জনের সাফল্য কারÑ এ বিতর্ক থাকা দোষের নয়। সাফল্যের ম্যাজিক বা ভেতর-বাইর জানা সবার পক্ষে সম্ভব না হওয়ারই কথা। অগ্রগতি যে হচ্ছে সেটা মূল কথা। এজন্য গর্ব জাগাও স্বাভাবিক। মানবিক উন্নয়ন ও জেন্ডার সমতার ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। ২৫ মিলিয়ন নারী ক্ষুদ্র ঋণের আওতায় এনেছে এবং অভিবাসীদের প্রেরিত মোটা অঙ্কের রেমিট্যান্সের কারণে বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষায় বাংলাদেশের পদক্ষেপ ও ভূমিকা প্রশংসা পাচ্ছে দেশে দেশে। এরই মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান সম্মানজনক আসনে। এছাড়া সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অর্জন অসাধারণ।

৫০ বছর আগে বাংলাদেশ এ অবস্থায় ছিল না। যুদ্ধকালে একাত্তরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। খাদ্য উৎপাদন হতো ১ কোটি ১০ লাখ টন। সে খাদ্য দিয়ে দেশের মানুষের তিন বেলার ব্যবস্থা হতো না। খাদ্যের জন্য তাকিয়ে থাকতে হতো বিদেশের দিকে। সে সময় দেশি আউশ ও আমনের চাষ হতো বেশি। বিলের নিচু এলাকায় সামান্য পরিমাণ জমিতে হতো বোরো চাষ। ফলনও ছিল খুব কম। চৈত্র-বৈশাখ মাসে মিষ্টি আলু খেয়ে দিন কাটানো ছিল নিয়তির মতো।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের নীরব বিপ্লব খুব ব্যাকরণ মেনে আসেনি। বাংলাদেশ ও দেশটির মানুষের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেই হয়েছে। বিগত দশকে বাংলাদেশে জিডিপি ছিল গড়ে ৬ ভাগের বেশি। ফলে বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের হার ২৪.৮ ভাগ এবং হতদরিদ্র মানুষের হার ১১.৯ ভাগে নেমে এসেছে। বাংলাদেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে এখন ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলার এবং মানুষের গড় আয়ু ৭২.৬ বছরে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। শিক্ষার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪.৭ ভাগ। কমেছে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় শতভাগ শিশু বিদ্যালয়ে যায়। শতভাগ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করে।

প্রতিটি গ্রামগঞ্জে পাকা রাস্তা নির্মাণ ও বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কুটির শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। দেশের অক্লান্ত পরিশ্রমী কৃষক, মৎস্য চাষি এবং পোল্ট্রি ও গো-খামারিরা এ বিপ্লবের নায়ক। তারা অবচেতনেই বিকশিত। বিকাশের অভ্যাস যার তাকে ফ্যাকাশে করা যায় না। ফুটতে তার টব লাগে না। উন্নয়ন-অগ্রগতি স্বীকার-অস্বীকার, বেশি করে বলা, কমিয়ে বলা প্রাগৈতিহাসিক। ব্রিটিশরা এই উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে মাথাপিছু আয়ের হিসাবে তেমন তফাৎ ছিল না। দুই ভূখণ্ডেই তা ছিল ৬০ ডলারের মতো। তৎকালীন জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল মোট বিনিয়োগের ৫৪ শতাংশ। আদতে হয়েছে ২৫ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ ১০০ ডলার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তান পেয়েছে ৭৫ ডলার আর পূর্ব পাকিস্তান পেয়েছে ২৫ ডলার।

সরকারি বিনিয়োগের এই বৈষম্যের অনিবার্য প্রভাব পড়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও মাথাপিছু আয়ে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ১৯৭২ সালে অর্থাৎ আমাদের স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রথম বছরে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ছিল ৯৫ ডলার আর পশ্চিম পাকিস্তানে মাথাপিছু আয় ছিল ১৫৪ ডলার। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশ যাত্রা শুরুই করেছিল পাকিস্তান থেকে ৫৯ ডলার পিছিয়ে।
তারপর আছে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন ধ্বংসলীলা।

তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণে বাংলাদেশে যা কিছু ভৌত অবকাঠামো ছিল তা মারাত্মকভাবে ধ্বংস হয়, তৎকালীন মূল্যমানে যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার সময় অবিভক্ত পাকিস্তানের রাজকোষে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা ছিল তৎকালীন মূল্যমানে প্রায় ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা পাকিস্তান বাংলাদেশকে দেয়নি। বলতে গেলে শূন্য কোষাগার নিয়ে শুরু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির। নানান প্রতিকূলতাকে ডিঙ্গিয়ে আগের চেয়ে যে বাংলাদেশ ভালো আছে সেটা মানতে সমস্যা কোথায়? সাফল্য যাকে-তাকে দিলেও সমস্যা নেই। বাংলাদেশ তো বাংলাদেশের মতোই।

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।
mostofa71@gmail.com

-ভোরের কাগজ

 

 

সংবাদটি শেয়ার এবং লাইক করুন