পাট: পরিবেশ বান্ধব আঁশ ফসল

কৃষিবিদ মোঃ জ্যাবলুল তারেক : পাট পরিবেশ বান্ধব প্রাকৃতিক তন্তু যার বহুবিধ ব্যবহার হাজার বছর ধরে বাংলার ঘরে ঘরে চলে আসছে। শুধু দেশে নয়, পাটের ব্যবহার আজ বিশ্বব্যাপী। পাটের জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ হল এর বিভিন্ন পরিবেশ-বান্ধব উপকারিতা। এটি একক জমিতে প্রতি বছর সর্বোচ্চ পরিমান জীবাশ্ম সম্পদ উৎপাদন করে।

পাট পণ্য সহজে পচনশীল হওয়ায় সাধারনভাবে এটি পরিবেশ বান্ধব। অধিকন্তু, পাটের পাতা ও অন্যান্য উচ্ছিস্টাংশ মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমান বৃদ্ধি করে যা মাটিতে রাসায়নিক সার পরিমান কমাতে সাহায্য করে। দোঁ-আশ মাটি এবং উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া পাট চাষের জন্য ভালো।

পাটের উচ্ছিস্টাংশ থেকে প্রসাধনী রং, ঔষধ ইত্যাদি তৈরী হয়। পাট শাক একটি উপাদেয় সব্জি। গ্রামের মানুষেরা পাট পাতা শুকিয়ে সংরক্ষণ করে এবং সারা বছর সব্জি হিসাবে খেয়ে থাকে। এটি বহুবিধ ভেষজ গুণে গুনান্বিত। এর পাতায় প্রচুর পরিমানে ভিটামিন-এ, সি, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও প্রোটিন বিদ্যমান। প্রতিরোধ করে ক্যান্সারের মত দুরারোগ্য ব্যাধিও। পাট পাতার রস রক্ত-পিত্তনাশক, বাত নিরোধক, ক্ষুধা বৃদ্ধিকারক, আমাশয়, উদরাময় ও অ¤ø রোগের মহৌষধ।

তাছাড়া এতে প্রচুর পরিমান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন-মিনারেল ও ফাইটোকেমিক্যাল আছে যা অনেক দামি ফলমূল বা সব্জিতেও পাওয়া যায় না। মোটামুটিভাবে ৪-৬ মাসে পাট কর্তন করা যায়। পাট থেকে হেক্টর প্রতি ২০-৪০টন খড়ি পাওয়া যায়। পাট খড়ি কৃষকের কাছে পাটের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। এর দ্বারা তারা ঘরের বেড়া, চাল তৈরী, সব্জি ক্ষেতে মাঁচা তৈরী ও জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করে।

তুলনামূলকভাবে বনভূমির কাষ্ঠল বৃক্ষ পরিনত হতে ১০ থেকে ৪০ বছর সময় লাগে যা বছরে ৮-১২ টন কাঠ উৎপাদন করে । এ থেকে বোঝা যায় পাটের জীবীয় সক্ষমতা বনজ উদ্ভিদের চেয়ে বেশি। অন্যান্য উদ্ভিদের ন্যায় পাট গাছ বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষন করে এবং বাতাসে অক্সিজেন নিঃসরন করে। পাটের কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষনের হার অন্যান্য উদ্ভিদের তুলনায় বহুগুনে বেশি।

এক হেক্টর জমির পাট গাছ তার জীবনকালে (১০০ দিনে) ১৫ টন পর্যন্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষন করে এবং ১১ টন অক্সিজেন নিঃসরন করে। পাটখড়ি বা পাটকাঠির কার্বন চারকোল নামে পরিচিত। পাট খড়ি থেকে উৎপন্ন চারকোল থেকে আতশবাজি, কার্বন পেপার, কম্পিউটারের প্রিন্টার ও ফটোকপিয়ার মেশিনের উন্নত মানের কালি, মোবাইলের ব্যাটারি, ফেসওয়াশের উপকরন ও প্রসাধণপণ্য, পানির ফিল্টার , বিষ ধ্বংকারী ওষুধ, দাঁত পরিষ্কারের ঔষধ ও সারসহ নানা পণ্য তৈরী হয় । চারকোলের বড় বাজার রয়েছে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলোতে। বহির্বিশ্বে প্রতিনিয়তই চারকোলের চাহিদা বাড়ছে।

দেশি উদ্যোক্তারাও আগ্রহী হয়ে উঠছে এ খাতের প্রতি। সংশ্লিষ্টদের মতে, পাটখড়ি থেকে কার্বন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। পাট অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন পাটকাঠি উৎপাদিত হয়। এর ৫০ শতাংশের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলেও পাটকাঠির কয়লার বার্ষিক উৎপাদন দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টন, যা বিদেশে রপ্তানি করে বছরে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। প্রসঙ্গত, চারকোল বা এক্টিভেটেড কার্বন পাটখড়ি থেকে উৎপাদিত একটি পণ্য।

এছাড়া কাঠের গুঁড়া, নারকেলের ছোবড়া ও বাঁশ থেকেও চারকোল উৎপাদন হয়ে থাকে। তবে দেশে এখন পর্যন্ত পাটখড়ি থেকেই চারকোল উৎপাদিত হয়ে আসছে। জানা গেছে, বিশেষ চুল্লিতে পাটখড়ি লোড করে তাতে আগুন দেয়া হয়। ১০-১২ ঘন্টা রাখার পর চুলা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয়, যাতে চুলার ভেতরে অক্সিজেন প্রবেশ করতে না পারে। এভাবে চারদিন রাখার পর এটি কার্বনে পরিণত হয়। পরে সেই কার্বন প্যাকেজিং করে রপ্তানি হয় বিদেশে।

পাট থেকে উৎপন্ন পলিথিন ব্যাগ বাজারে প্রচলিত পলিথিন ব্যাগের যথোপযুক্ত বিকল্প পরিবেশ বান্ধব ব্যাগ। দেশী পাট থেকে সুতা তৈরী প্রধান কাঁচামাল ভিসকস তৈরী হয়। ভিসকস দেখতে সুতার মত কিন্তু তার থেকেও সূক্ষ। ভিসকস ব্যবহৃত হয় তুলার বিকল্প হিসাবে সুতা তৈরীর কাজে। এ জন্য সরকারি পাটকলগুলোর মানোন্নয়ন করতে হবে। যদি বাংলাদেশে পাট থেকে ভিসকস উৎপাদিত হয় তবে বিদেশ থেকে তা আর আমদানি করতে হবে না।

এছাড়া পাট থেকে ভিসকস উৎপাদিত হলে এবং এর দ্বারা উৎপাদিত সুতার মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত কাপড়ের সাহায্যে গার্মেন্টস সামগ্রী তৈরী করা হলে শতভাগ মূল্য সংযোজন করা সম্ভব। কাঁচা পাট থেকে সুতলি, দড়ি, কাছি, চট, বস্তা, কার্পেট, পাপোস, ছিকা এমনকি জুতা-সেন্ডেলসহ বিভিন্ন ধরনের হস্ত ও কুটির শিল্পের পণ্য তৈরী হয় এবং তা বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। এছাড়াও গাড়ীর বডি ও সিটের কভার এবং কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক সামগ্রির প্যাকেজিং পণ্য হিসাবে পাটপণ্য ব্যবহৃত হচ্ছে।

লেখক:

বিজ্ঞানী ও পাট গবেষক, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, জাগীর, মানিকগঞ্জ।

মোবাইল: ০১৭২২-৭৪৮২২৪

zablulbarj@gmail.com

 

সংবাদটি শেয়ার এবং লাইক করুন