মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় বিলুপ্ত করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর একটি বিশেষ উইং-এ ন্যস্ত করুন

আবীর আহাদ


মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী, মুবি-মন্ত্রণালয় ও জামুকা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুমড়ে মুচড়ে ধুলায় লুটিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা একদিকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় হাজার হাজার অমুক্তিযোদ্ধা এমনকি রাজাকারদেরও মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে চলেছেন, অপরদিকে রাজাকার তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ঢুকিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধসম্পর্কিত বিষয়াদি নিয়ে চরম তুঘলকি কর্মকাণ্ড করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জাতির সামনে হেয়প্রতিপন্ন করে তুলেছেন। তারা বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞা পাশ কাটিয়ে গোঁজামিল সংজ্ঞা ও নির্দেশিকা দিয়ে এমন সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যার ফলে অর্থ, আত্মীয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাবে যখনতখন যেকেউ বীর মুক্তিযোদ্ধা বনে যাচ্ছে! প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা সঠিক তালিকা প্রণয়নের জন্য যতোই আবেদন নিবেদন আন্দোলন সংগ্রাম ও লেখালেখি করছেন, ততোই তারা যেনো পাল্লা দিয়ে একের পর এক অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েই চলেছেন। এমনও উদাহরণ ইতোমধ্যে তারা সৃষ্টি করেছেন যে, সামরিক বাহিনী তাদের অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা, যাকে মুক্তিযোদ্ধা হিশেবে স্বীকৃতি দিয়ে সেনা গেজেটে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করেনি, সেখানে জামুকা সমস্ত নিয়ম কানুন শৃংখলার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সেই তথাকথিত সেনা-মুক্তিযোদ্ধা দাবিদারকে বেসামরিক গেজেটে বীর মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে দিয়েছে! অতীতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ৪০ হাজারের ঊর্ধে অমুক্তিযোদ্ধাসহ রাজাকার-আলবদরদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছিলো, সেবিষয়ে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী-সাংসদ জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে একাধিকবার প্রতিবাদ জানিয়ে ছিলেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাদের উচ্ছেদ করা হবে। কিন্তু আজ একনাগাড়ে ১৩টি বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকেও তারা সেসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের উচ্ছেদ তো করেনইনি, উপরন্তু তথাকথিত যাচাই বাছাইয়ের নামে চরমতম উদগ্র বাণিজ্যিক ধান্দার মাধ্যমে তাদেরকে পুন:তালিকাভুক্ত করেই ক্ষান্ত হয়নি, বিএনপি-জামায়াতের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাদের সৃষ্ট জামুকার নীতিমালার তথাকথিত ক্ষমতাবলে তারাও হাজার হাজার অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে চলেছেন! এ প্রক্রিয়ায় যেখানে প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ১ লক্ষ ৫০ হাজারের অনেক নিচে, সেখানে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লক্ষ ২৪ হাজারের মতো। আরো বহুসংখ্যক পাইপলাইনে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের যে মতিগতি তাতে মুক্তিযোদ্ধা সৃষ্টির মেশিনটি অনির্দিষ্টকালের জন্য চালু থাকবে বলে মনে হয়। আমরা আশ্চর্য হচ্ছি, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের আবির্ভাব, সেই আওয়ামী লীগ সরকারের জামুকা নামক এক দানবীয় সত্তার হাতে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা কলঙ্কিত হচ্ছে! এতো বাদপ্রতিবাদ আবেদন নিবেদনের পরেও তাদের হৃদয়ে কোনো দাগ কাটছে না! এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী প্রকৃত কোনো মুক্তিযোদ্ধার প্রকৃতি নয়!

এছাড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জামুকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচার-আচরণে প্রকাশ পায় যে, এদের অধিকাংশই চরম মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা বিদ্বেষী। বিশেষ করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে দুর্ব্যবহারসহ সেবার ক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করাই তাদের কাজ। তারা অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের নামের বানান ভুল লিখে, সেই ভুল শুধরে দেয়ার অজুহাতে ঘুষ নিয়ে থাকে, অন্যথায় সেই মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বন্ধ করে দেয়। শুধু তাই নয়, এখানকার বেশকিছু কর্মকর্তা নিজেরাই মুক্তিযোদ্ধা বনে গেছেন, এমনকি কেউ কেউ নিজের বাবা ও শ্বশুরকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছিল এমন দৃষ্টান্তও রয়েছে।

অন্যদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা, বাসস্থান, কিছুটা উন্নত আর্থসামাজিক জীবন, তাদের সন্তানদের কর্মসংস্থান, জীবনের নিরাপত্তাসহ তাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী, মুবি-মন্ত্রণালয় ও জামুকা পুরোপুরি নীরব। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ছত্রচ্ছায়ায় প্রায় প্রতিদিনই মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকার পরিবারের হাতে লাঞ্ছিত অপমানিত নিগৃহীত হচ্ছেন। কেউ কেউ হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ ও হামলা-মামলার শিকার হচ্ছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মহোদয়ের এতে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। জামুকা ও মন্ত্রণালয়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা সমুন্নত রাখার প্রশ্নে কী কী কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত, সেসব বিষয়ে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা আছে বলেও মনে হয় না! তবে তারা শুধু যখনতখন যাকেতাকে মুক্তিযোদ্ধা বানাতে খুবই সিদ্ধহস্ত।

উপরোক্ত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দেখভাল, তাদের মর্যাদা সংরক্ষণ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-চেতনাকে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জামুকার বিলুপ্ত করে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধসম্পর্কিত বিষয়াদি সম্পাদন করার লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা বাহিনীতে একটি বিশেষ উইং সৃষ্টি করে সেই কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যস্ত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা যেহেতু সামরিক নিয়মে গঠিত একটি সশস্ত্র সংস্থা হিশেবে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, সেহেতু সেই ঐতিহাসিক ভূমিকার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার লক্ষ্যে সামরিক নিয়ম কানুন শৃংখলার অধীনে থাকাই যুক্তিযুক্ত। সেজন্য প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করতে হবে। এছাড়া প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের কারিগরদের কঠিন শাস্তির আওতায় আনার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭২ সালের মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞার আলোকে উচ্চ আদালত ও সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে “জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কমিশন” গঠন করা যেতে পারে।

আমরা আশা প্রকাশ করছি যে, বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা ও তাদের জাতীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী, মুবি-মন্ত্রণালয় ও জামুকার দানবীয় কবল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তি দেবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলছি যে, উক্ত ত্রিরত্ন তাঁর বিশ্বাস ও আস্থাকে ব্ল্যাকমেল করে তারা ব্যক্তি ও অন্য কারো অশুভ স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় মর্যাদাকে ভুলুন্ঠিত করার এক সর্বনাশা অপকর্মে লিপ্ত রয়েছে, আর এসবের দায়দায়িত্ব গিয়ে পড়ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ওপর!

অতএব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর নিজের মর্যাদা সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে অবিলম্বে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিলুপ্ত করে, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধসম্পর্কিত বিষয়াদি দেখভাল ও রক্ষণাবক্ষেণ করার লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে একটা বিশেষ উইং গঠন করে আনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন বলে আমরা প্রবল প্রত্যাশা রাখছি।

লেখক :চেয়ারম্যান, একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।

 

 

সংবাদটি শেয়ার এবং লাইক করুন