নন্দীগ্রামে ধান্দা নির্ভর নাজমুল হুদা (!)

তাজা খবর অনলাইন ডেস্ক :: নাজমুল হুদা (৪৬) পরিচয় দেন প্রেসক্লাবের সভাপতি। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্তও লেখাপড়া করার প্রমাণ মেলেনি। প্রশাসনের বিভিন্ন সভায় সুযোগ পেলেই কর্মকর্তাদের পাশের চেয়ারে বসেন। বেতনভুক্ত কোনো চাকরি নেই, অঢেল সম্পদ বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই। কোনো ইনকাম সোর্স না থাকলেও তার প্রতিদিনের ব্যয় প্রায় হাজার টাকা। একাধিক বিয়ে করলেও সংসার টিকেনি।

বগুড়ার নন্দীগ্রাম পৌর সদরের মাঝগ্রাম পুরাতন সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস এলাকায় বসবাস করেন নাজমুল হুদা। তিনি এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা নন। তার পিতার নাম মৃত মোত্তালেব (মুক্তাল মিস্ত্রি)। নাজমুল হুদা কখনো পরিচয় দেন সাংবাদিক, আবার কখনো উপজেলা যুবলীগের সাবেক নেতা ও শ্রমিকলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ভূয়া পরিচয় দেন।

অথচ তিনি বিএনপি সরকার আমলে নন্দীগ্রাম উপজেলা জামায়াতের তৎকালিন আমীর মরহুম খোরশেদ আলীর মার্কেটে জামায়াতের দলীয় অফিসে সভা-সমাবেশে নিয়মিত বক্তৃতা দিতেন। কথিত সাংবাদিক নাজমুল হুদার বিরুদ্ধে নারীর শ্লীলতাহানি-চাঁদাবাজির অভিযোগে আদালতে দুটি মামলা ও থানায় তিনটি জিডি রয়েছে। ইতিপূর্বে দুই বছর থানায় প্রবেশ করতে পারেনি ওই ব্যক্তি। গুজব ছড়ানোর ঘটনায় উপজেলা পরিষদের সামনে গনপিটুনিও দিয়েছিলেন তৎকালিন চেয়ারম্যানের লোকজন।

এছাড়া থানা পুলিশের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে নাজমুল হুদার বিরুদ্ধে জিডি করেছিলেন তৎকালিন উপ-পুলিশ পরিদর্শক (সেকেন্ড অফিসার) ও বর্তমানে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আকিবুল ইসলাম। নাজমুল হুদার বিরুদ্ধে এক ব্যক্তি আদালতে চাঁদাবাজি মামলা দায়ের করার পর সম্প্রতি এক নারী বাদী হয়ে শ্লীলতাহানি, অপহরণের চেষ্টা, মারপিট, লুটপাট ও চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। ওই নারী আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধিন ছিলেন।

অনুসন্ধানে ও প্রাপ্ততথ্যে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর কৌশলে নেতাদের সাথে সখ্যতা ও রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ নেয় এই হুদা। নিজেকে সাবেক যুবলীগ নেতা পরিচয় দিতে শুরু করে। কখনো কখনো পরিচয় দেন সাবেক শ্রমিকলীগ নেতা। কথিত সাংবাদিক নাজমুল হুদা নিজেকে কখনো স্থানীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং কখনো সভাপতি পরিচয় দিয়ে প্রশাসনের কর্তাদের সাথে সখ্যতা গড়ার চেষ্টা করেন। সিনিয়র কর্মকর্তারা নন্দীগ্রামে পরির্দশনে এলেই সেলফি নেওয়ার ধান্দায় থাকে এই কথিত সাংবাদিক। প্রশাসনের বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ খোঁজে।

প্রশাসনের কর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে মোবাইলে সেলফি এবং প্রশাসনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে-সভামঞ্চে বক্তৃতার সুযোগ নিয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করে নিজেকে হেভিওয়েট হিসেবে প্রচার করেন। বিভিন্ন ছোট-বড় ঘটনায় থানায় কেউ অভিযোগ করলেই কথিত সাংবাদিক নাজমুল হুদার দৌরাত্ম লক্ষ্য করা যায়। প্রত্যন্ত গ্রামে বাল্য বিয়ে, জমিজমা সংক্রান্ত ঘটনা, পুকুর খনন, অসামাজিক কর্মকান্ড, মাদক ব্যবসায়ী, জুয়ার আসর ও সরকারি জায়গা অবৈধ দখল করে ঘর নির্মাণের খবর পেলেই সেখানে ছুটে যায় এই হুদা। কোনো ইনকাম সোর্স না থাকায় প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে এবং গ্রামের মানুষদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নেন বখরা।

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ধান্দায় নির্ভর নাজমুল হুদা। বিশেষ ব্যক্তিদের সঙ্গে সখ্যতা আছে বলে প্রচার করা এবং সেলফি ছবি দেখিয়ে গ্রামের মানুষের সরলতার সুযোগে প্রতিনিয়ত চাঁদাবাজি করছে। কখনো কখনো বিশেষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপপপ্রচার করাসহ বিপাকে ফেলে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ারও তথ্য পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের এক সাবেক সিনিয়র নেতা বলেন, বিএনপি আমলে বগুড়া জেলা জামায়াতের মুখপাত্র হিসেবে ব্যাপক পরিচিত একটি পত্রিকায় খবর পৌঁছানোর কাজ করতেন নাজমুল হুদা। এছাড়াও তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের বার্তা বাহক ছিলেন। সুযোগ বুঝে জামায়াতের সেই পত্রিকায় কৌশলে সংবাদকর্মীর পরিচয়পত্র হাতিয়ে নিয়ে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতে শুরু করে। উপজেলা জামায়াতের দলীয় সভা-সমাবেশে নিয়মিত বক্তৃতাও দিতেন।

১৯৯১ সালে নন্দীগ্রাম উপজেলায় প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে এক সিনিয়র সাংবাদিক জানান, নাজমুল হুদার মা (সোবাহানের মা নামে পরিচিত) ছিলেন মানসিক রোগী। কিন্তু এই হুদা ছিল অমানবিক সন্তান। তার নিজের মা দিনরাত রাস্তায় এবং যাত্রী ছাওনিতে পড়ে থাকলেও খোঁজখবর রাখতেন না। অথচ মায়ের চিকিৎসার কথা বলে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সহায়তা নিতেন। এনিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তৎকালিন থানার ওসি মো. নাসির উদ্দিন নিজ অফিসে সাংবাদিকদের ডেকে রেজুলেশনের মাধ্যমে নাজমুল হুদার উপস্থিতিতে তার মায়ের চিকিৎসা সহায়তা ফান্ড করেছিলেন। এর বেশ কিছুদিন পর সন্তানের অবহেলা আর চিকিৎসার অভাবে সেই মা মারা গেছেন।

স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, ইতিপূর্বে জাতীয় দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় ভূয়া শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখিয়ে কৌশলে নিয়োগ নিয়েছিলেন নাজমুল হুদা। বেশ কিছুদিন পর প্রতারণার বিষয়টি পত্রিকার কর্তৃপক্ষ জেনে ফেলেন। এরপর নাজমুল হুদাকে পত্রিকা থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়। সাবেক যুবলীগ নেতা ও সাবেক শ্রমিকলীগ নেতা হিসেবে ভূয়া পরিচয়ধারী এই হুদাকে জেলা জামায়াতের পত্রিকা থেকেও অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। তবুও থেমে নেই হুদার ধান্দা।

দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার সাংবাদিক উল্লেখ করে একটি ভিজিটিং কার্ড করেছেন। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের অফিসসহ প্রত্যন্ত গ্রামের বাজারে গিয়ে ব্যক্তিদের কাছে ভূয়া পরিচয়ের ওই ভিজিটিং কার্ড দিচ্ছে কথিত সাংবাদিক নাজমুল হুদা। এ ঘটনার একটি ভিডিও এসেছে প্রতিবেদকের কাছে। বিষয়টি জেনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারি দিয়ে ফেসবুকে কয়েক লাইন লিখেছেন দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি প্রতীক ওমর।

 

সংবাদটি শেয়ার এবং লাইক করুন