আয় কম ব্যয় বেশি, দিশেহারা সাধারণ মানুষ

তাজা খবর প্রতিবেদক :: দ্রব্যমূল্য ও মানুষের জীবনযাত্রা একইসূত্রে গাঁথা। প্রতিটি পরিবার কীভাবে দৈনন্দিন জীবন নির্বাহ করবেন তা নির্ভর করে তাদের চাহিদা, আয়-ব্যায়ের উপর। নিত্যপণ্যের মূল্য যখন ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, তখন মানুষের মাঝে স্বস্তি ও শান্তি দেখা যায়। অন্যদিকে নিত্যপণ্য যদি ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন মানুষের মধ্যে নেমে আসে নানা অস্বস্তি, অসুবিধা।

সাধারণ মানুষ বলছেন, আয় বাড়ছে না। ব্যায় বাড়ছে দেদারছে । সকল জিনিসের দাম লাগামহীনভাবে বেড়েই চলছে, নেই নিয়ন্ত্রণ। এমন পরিস্থিতিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। অনেকেরই মাসের রোজগার দিয়ে পরিবার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে৷ আবার অনেকে বাধ্য হয়ে রাজধানী ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন।

কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি থেকে এই শহরে এসেছিলেন মো. আনিসুর রহমান। চাকরি করেন রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভাড়া থাকতেন মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থায় দেশে হঠাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। তাই চাপ সামলাতে না পেরে স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তার সাথে কথা হয় তাজা খবর প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, করোনা মহামারির সময় আমাদের ঢাকা ছাড়তে হয়েছে। তখন তো কিছু করার ছিল না। কিন্তু সেসময় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এখনকার মত এত বেশি বাড়ে নাই, মহাবিপর্যয়ের সময়ও সহনীয় অবস্থায় ছিল। অথচ এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অস্বাভাবিক। ব্যাবসায়ীদের কাছে সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে গেছে, দেখার কেউ নাই।

 

 

তিনি আরও বলেন, যে চাকরি করি তা দিয়ে বর্তমানে সবাইকে নিয়ে থাকা কষ্টকর। আবার গ্রামে মা-বাবাকে কিছু দিতে হয়। জিনিসপত্রের দাম অতিরিক্ত, এছাড়াও বাসা ভাড়া, কারেন্ট বিল, পানির বিল, গ্যাস বিল, ময়লার বিল সবমিলিয়ে অনেক খরচ। যা আমার পক্ষে পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকা খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। শুধু থাকা-খাওয়ার খরচ সামলাতে না পেরে পরিবারের সবাইকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। একা মেছে থাকব। মাঝে মাঝে মনে হয় চাকরি ছেড়ে গ্রামে চলে যাই। কিন্তু বাড়ি গেলে কি করব, কিভাবে চলব, আরও খারাপ অবস্থা হবে। তাই কষ্ট করে হলেও ঢাকায় থাকতে হবে।

দেশের অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে সরকার জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল পণ্যের দাম বেড়েছে । অথচ মানুষের জীবনযাত্রার মান না বেড়ে উল্টোদিকে যাচ্ছে।

রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশুনা করছেন মো.আবু নোমান রকি। জিনিসপত্রের দাম নিয়ে তাজা খবর প্রতিবেদকের কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে জ্বলানির দাম বাড়ানো হয়েছে। রুটিন করে লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে। করোনা মহামারিতে পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়ে। কিন্তু তার প্রভাব আমাদের দেশে তেমন পড়েনি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বে জ্বলানির সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে দেশে জ্বলানির দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর পর থেকেই সকল পণ্যের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। আবার অনেক অসাধু লোক এটাকে কেন্দ্র করে সুবিধা নিচ্ছেন।

আবু নোমান রকি বলেন, বাবা গ্রামের হাই স্কুলের শিক্ষকতা করেন। এছাড়াও কিছু ছাত্র-ছাত্রী পড়ান বাড়তি আয়ের জন্য। আমার পরিবারে বাবাই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। পরিবারে আমার ছোট বোন, মা, দাদি আছে- তাদেরও খরচ আছে। আমার খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন বাবা। প্রতি মাসে বাড়ি থেকে যা টাকা পাঠাতো এখন তার থেকে ২-৩ হাজার টাকা বেশি পাঠাতে হয়। এতে পরিবারের বিশেষ করে বাবার প্রতি বাড়তি চাপ হয়ে যাচ্ছে। ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু তাদের আয় বাড়ানি। আগে আমার মিল ছিল ৩৬ টাকা, বর্তমানে তা ৪৪ টাকা। বাসার মালিক বলে গেছেন সেপ্টেম্বর মাস থেকে ভাড়া বাড়িয়ে দিতে হবে। সাবান থেকে শুরু করে সকল পণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। দ্রুত জ্বালানির দাম কমাতে হবে। এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।

দেশের অর্থনৈতিক সংকটে চাকুরীজীবী, ছাত্র-ছাত্রীদের পাশাপাশি সকল শ্রেণির মানুষ পরেছেন বিপাকে। কোনোভাবে দিন পার করছেন খেয়ে না খেয়ে।

 

 

রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে আজ দুপুরে একটি মাইক্রোবাস অন্যপাশ থেকে আসা একটি মাইক্রো ও রিক্সাকে ধাক্কা দেয়। রিক্সা চালকের কিছু না হলেও রিক্সার দুই চাকার বিয়ারিং ও স্ক্রু ভেঙ্গে যায়। তাই তিনি বা হাত দিয়ে রিক্সার হাতল আর ডান হাত দিয়ে নিচের পাত্তি ধরে মেকারের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন। কিছুদূর এভাবে যাওয়ার পর ক্লান্ত হলে দাঁড়ান। তখন রিক্সাচালক মো. মশিউর রহমানের সাথে কথা হয় তাজা খবর প্রতিবেদকের। তিনি জানান, আগে ঢাকায় রিক্সা চালাতেন। করোনা প্রকট বাড়াতে কর্মহীন হয়ে গ্রামে চলে যান। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার পর আবার ঢাকায় আসেন। বাড়ি নেত্রকোনার সদরে। এখন রাজধানীর হাতিরপুল বাজারের পাশে একটি গ্যারেজে থাকেন। তিনি জানান, রিক্সার ক্ষয়ক্ষতির জন্য ৫০০ টাকা দিয়েছেন। যা টাকা পেয়েছেন তা দিয়ে সারাইয়ের কাজ হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, সারাদিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা ইনকাম করি। তার পরেও সংসার ঠিকভাবে চলে না। দৈনিক রিক্সা ভাড়া বাবদ ২৫০ টাকা জমা দিতে হয়। আমার খাওয়া-থাকা, অনেক খরচ। আয়ের চেয়ে ব্যয়ই বেশি। কারণ সবকিছুর দাম বাড়ছে।

আগে পরিবারের সবাই ঢাকা থাকতেন। স্ত্রী বাসায় বাসায় কাজ করতেন বলে জানান মশিউর রহমান। তিনি বলেন, করোনার আগে সবাই ঢাকা ছিলাম। এখন গ্রামে মা, বউ, পোলার- মাইয়া থাহে। তাগর স্কুলের খরচ, খাওন খরচ দিতে হয়। নিজে খাইয়ে না খায়ে কোনোরকম দিন পার করি। একটা পাউরুটি ১৫ টাকা, চা ১০ টাকা। জিনিসপাতির দাম না কমলে আমাগর মরণ ছাড়া উপায় নাই।

 

 

রাজধানীর বাংলামোটরে রাস্তার পাশে মটরসাইকেলে বসে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মো. কামরান মিয়া। জামালপুরের সরিষাবাড়ি থেকে চাকরির খোঁজে ঢাকায় আসেন। চাকরি না পেয়ে বাড়ি থেকে কিস্তিতে টাকা নিয়ে একটি মটরসাইকেল কিনেন। রাজধানীতে তা চালিয়ে যে টাকা উপার্জন করেন তা দিয়ে গ্রামে একটি পরিবার চালান এবং কিস্তি দেন। তাজা খবর প্রতিবেদকের কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, পরিবার নিয়ে ভাবছি, আসলে কি করব এখন। গ্রামের কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করছি। চাকরির জন্য চেষ্টা করেছি, হয়নি। চাকরি না পেয়ে ঢাকায় হোটেল থেকে শুরু করে হকারি পর্যন্ত করেছি। এখন মোটরসাইকেল চালাই।

তিনি আরও বলেন, জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বেড়েছে আমাদের আয় তেমন বাড়েনি। সরকার জ্বলানি তেলের দাম অতিরিক্ত বাড়িয়েছে। যাত্রীরা ভাড়া বেশি বলে মোটরসাইকেলে যেতে চায় না। আবার গাড়ির সংখ্যাও বেড়ে গেছে। আমাদের আয় কমছে, আর অন্যদিকে বাসা ভাড়া, চাল-ডাল, আলু-পেঁয়াজ, তেল, আটা-ময়দা থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম বেড়েছে। যার ফলে আমাদের মত সাধারণ মানুষ দূর্ভোগে পরেছে। সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

শহরে থাকা ও খাওয়ার জন্য অনেক টাকা খরচ হয়। যা দিয়ে গ্রামে একটি পরিবার চলতে পারবে। মাসে যা আয় করি তা কিস্তি দিয়ে বর্তমান সময়ে চলা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ভাবছি আবার গ্রামে ফিরে যাব।

 

 

 

সংবাদটি শেয়ার এবং লাইক করুন